আজ হুমায়ূন আহমেদ স্যারকে শ্রদ্ধা জানাতে বসে

আমার ধারণা ছিলো না - কোনো স্মরণসভা এতোটা চমৎকার হতে পারে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে আমরা অনেক মানুষ আজ হুমায়ূন আহমেদ স্যারকে শ্রদ্ধা জানাতে বসে থেকেছিলাম টানা তিন ঘন্টা। 
বক্তৃতা দিয়েছেন জাফর ইকবাল স্যার, ইয়াসমিন হক, আনিসুল হক স্যার, শিলা আহমেদ সহ অনেকে। তাঁরা সবাই কেঁদেছেন। সাথে কাঁদিয়েছ
েন সবাইকে।

জাফর ইকবাল স্যার একেবারে শেষের দিকে এসেছিলেন বক্তৃতা দিতে। মাইকের সামনে এসেই বললেন, 'হুমায়ূন কখনো শোক সভা, আলোচনা সভা - এগুলো পছন্দ করতেন না। প্রায়ই তিনি কাছের মানুষদের সাথে রসিকতা করে বলতেন - আমার মৃত্যুর পর তোমরা কী শোক বাণি দেবে বলো তো?' আমরা তাই আজকের এই অনুষ্ঠানের নাম দিয়েছে স্মরণসভা। শোকসভা না।

এরপর জাফর ইকবাল স্যার অনেক কিছুই বলেছেন। তবে শেষের দিকে এসে যা বলেছেন সেটা কাঁদিয়েছিলো সবাইকে। কী বলেছিলেন হুবুহু মনে নেই। যতোটুকু মনে আছে সেটুকু বলার লোভ সামলাতে পারছিনা।

'আমার ভাইয়ের অতিপ্রাকৃত ব্যাপার নিয়ে আগ্রহ ছিলো অনেক। একটা ব্যাপার জানতে পারলে সে অবাক হতো নিশ্চয়ই।
১৯ তারীখ সকাল থেকে আমার আমাকে বারবার ফোন দিচ্ছিলেন, 'ইকবাল, হুমায়ূনের কী হয়েছে? নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। আমার কেনো জানি মন মানছে না আজ সকাল থেকে।' আমি মাকে বললাম, 'না মা। আগের মতোই আছেন আর খারাপ কিছু হয়নি।'
আমি মা'কে এটা বলে ফোন রাখার ঠিক পরেই ডাক্তার এসে বললেন, 'হুমায়ূন আহমেদের অবস্থা ভালো নেই। তিনি চলে যাচ্ছেন। কাছের মানুষরা শেষবারের মতো তাঁর কাছে যেতে পারেন।'
ইয়াসমিন, আমি সহ অন্যান্যরা দাদা ভাইয়ের রুমে গেলাম। এই রুমটাতে পৃথিবীর সেরা সব যন্ত্রপাতি। এখানে আগে ঢুকতে হলে নানারকম ড্রেস পরতে হতো। কিন্তু তখন ডাক্তার আমাদের জানালেন - আজ আর কিছুই লাগবে। হি ইজ নাউ বিয়ন্ড এভরিথিং।
আমরা দাদা ভাইয়ের কাছে গেলাম। ডাক্তার দেখালেন তার ব্লাড প্রেশার কমে যাচ্ছে, অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাচ্ছে।
আমি ডাক্তারকে বললাম, 'আপনি জানেন? কে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন? জানেন এই মানুষটার কতো ক্ষমতা? এই মানুষটা এভাবে চলে যাবেন?'
ডাক্তার বললেন, আমরা সব জানি। ইন্টারনেটে দেখেছি।
আমি ডাক্তারকে বললাম, 'এখন যদি কোনো মিরাকল ঘটে? এখন যদি ব্লাড প্রেশার রাইজ করে হঠাৎ? কী হবে তখন? আমরা কি আগের হুমায়ূন আহমেদকে ফিরে পাবো?'
ডাক্তার বললেন, 'হ্যাঁ। এখন মিরাকল ঘটলে আগের হুমায়ূন আহমেদই ফিরে আসবেন। তাঁর ব্রেইন সেল এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত ব্লাড পাচ্ছে।'
ব্লাড প্রেশার একটু একটু করে ফল করছে। আমি প্রতিবার ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করছি, 'এবার যদি কোনো মিরাকল ঘটে কী হবে তখন?'
প্রতিবার ডাক্তার জানাচ্ছিলেন এরকম কিছু হলে হুমায়ূদ আহমেদই ফিরে আসবেন।
কিন্তু একটা পর্যায়ে ডাক্তার বললেন, 'আর সম্ভব না। এখন যদি মিরাকল ঘটেও তারপরেও আগের মানুষটার ফিরে আসা সম্ভব না।'
আমি প্রথমবারের মতো অনুভব করলাম 'আমাদের সামনে যে মানুষটা শুয়ে আছে সে আর আমাদের হুমায়ূন নেই। অন্য কেউ।'
ব্লাড প্রেশার দ্রুত ফল করতে লাগলো। আমরা দাদা ভাইয়ের কাছে দিয়ে দাড়ালাম।
হঠাৎ মনিটরের লাইনটা ফ্ল্যাট হলে গেলো। বুঝে গেলাম সব শেষ। মানুষের মৃত্যুকে এভাবে লাইভ দেখানো যায় জানা ছিলো না।'

ঠিক এইখানে এসে জাফর ইকবাল স্যার থেমে গেলেন। মঞ্চ থেকে নেমে তাঁর চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লেন। পুরো অডিটোরিয়ামে তখন পিনপতন নিরবতা। যারা তখনও কাঁদেননি তাঁরাও আর নিজেদের সামলাতে পারলেন না। কান্নার শব্দ ছাড়া তখন আর কিছুই ছিলোনা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে।

No comments:

Post a Comment

Coveroo custom phone covers and cases

visitors

free counters